ডায়াবেটিস রোগীর স্নায়ুর সমস্যা

ডায়াবেটিস আমাদের একটি অতি পরিচিত রোগ। সমাজের অনেক লোক এই রোগে ভুগছে। শরীরের প্রায় সব অঙ্গের কার্যক্রমের ওপর ডায়াবেটিসের প্রতিক্রিয়া যেমন দেখা যায়, তেমনি নার্ভ বা স্নায়ুর ওপর অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের মারাত্মক প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়। ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি বলতে আমরা স্নায়ুর ওপর ডায়াবেটিসের প্রতিক্রিয়াজনিত প্রভাবকে বুঝি। অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিত এমনকি অনিয়মিতভাবে নিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের করণে ১০-১৫ বছর সময়ের মধ্যে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি দেখা দিতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের মধ্যেই ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি দেখা দেয়।

কারণ : ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির প্রকৃত কারণ খুব ভালোভাবে জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, রক্তে গ্গ্নুকোজের আধিক্যই এর কারণ। যেসব রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে না তারাই মূলত নিউরোপ্যাথির শিকার হয়। প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী নিউরোপ্যাথিতে আক্রান্ত হয়।
হাত ও পায়ের ব্যথা, ঝিনঝিন করা, অবশ লাগা ইত্যাদি ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির লক্ষণ।

ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি কয়েক রকমের হতে পারে। যেমন-
১. পেরিপেরাল নিউরোপ্যাথি (হাত ও পায়ের স্নায়ু আক্রান্ত হয়)।
২. প্রক্সিমাল নিউরোপ্যাথি (হাত ও পায়ের ওপরের দিকে মাংসপেশির স্নায়ু আক্রান্ত হয়)।
৩. অটোনমিক নিউরোপ্যাথি (হৃদতন্ত্র, রক্তনালি, পরিপাকতন্ত্র, মূত্র ও যৌনাঙ্গ, শরীরের রেচন প্রক্রিয়া ইত্যাদি আক্রান্ত হয়)।
৪. ফোকাল নিউরোপ্যাথি (কোনো একটি নির্দিষ্ট স্নায়ু আক্রান্ত হয়)।

পেরিপেরাল নিউরোপ্যাথি : ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পেরিপেরাল নিউরোপ্যাথি। এতে হাত ও পায়ের নিচের দিকের অংশ অর্থাৎ কনুইয়ের নিচে এবং হাঁটুর নিচের দিকের অংশে ব্যথা করা, জ্বালাপোড়া করা, ঝিনঝিন করা ও অবশ লাগা ভাব হয়। হাত ও পায়ের এই অংশ ঠাণ্ডা থাকে, লোম পড়ে যায়, হাত ও পায়ের অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়। আঘাত লাগলে বা পুড়ে গেলে ব্যথা পাওয়া যায় না। সে কারণে পায়ে প্রায়ই ঘা হয়, পচন ধরে। যে কারণে অনেক সময় পা কেটেও ফেলতে হয়। ডায়াবেটিসে রক্তনালি সরু হয়ে যায় বলে রক্ত চলাচল কম থাকায় ঘা সহজে শুকায় না।

প্রক্সিমাল নিউরোপ্যাথি : এতে হাত ও পায়ের ওপরের দিকের অর্থাৎ ঊরু বস্থিদেশ ও বাহুর মাংসপেশীর দুর্বলতা দেখা যায় এবং মাংসপেশী শুকিয়ে যায়। এটা সাধারণত বয়স্ক মানুষের হয় এবং চিকিৎসায় আরোগ্য হয়।

অটোনমিক নিউরোপ্যাথি : আমরা প্রায়ই আমাদের শরীরের ভেতর অনেক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ওয়াকিফহাল থাকি না। যেমন- হৃৎপিণ্ডের পাম্পিং, শ্বাস নেওয়া, খাদ্যের পরিপাক প্রক্রিয়া, খাদ্য গ্রহণের পর পরিপাক ও রেচন প্রক্রিয়া, শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বজায় রাখা। এসব হচ্ছে অটোনমিক নার্ভের কাজ। অটোনমিক নিউরোপ্যাথি হলে হৃৎপিণ্ডের গতির অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় রক্তচাপ কমে যায়। পেটের খাদ্য ঠিকমতো হজম হয় না, পেট ফুলে থাকে, মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। পায়খানা ও প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। যৌন প্রক্রিয়া বিঘ্ন হয়।

ফোকাল নিউরোপ্যাথি : যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট নার্ভে সমস্যা দেখা দেয় তখন তাকে ফোকাল নিউরোপ্যাথি বলে। যেমন শুধু হাত বা পায়ে সমস্যা হতে পারে।

উপসর্গ : যখন কোনো ডায়াবেটিস রোগী পায়ে বা হাতে ব্যথা, অবশ লাগা, ঝিমঝিম করা, শক্তি কমে যাওয়া, পায়ে ঠাণ্ডা বা গরম বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা বলে, পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, পায়ের লোম উঠে যায়, তখন বুঝতে হবে তার নিউরোপ্যাথির সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের বেশিরভাগ রোগীর পায়ে ঘা হয় এবং সহজে ঘা শুকায় না কিন্তু কোনো ব্যথা থাকে না। অটোনমিক নিউরোপ্যাথির ক্ষেত্রে মাথা ঝিমঝিম করে, বসা থেকে উঠলে মাথা ঘুরে ওঠে, বুক ধড়ফড় করে। পেট ফেঁপে থাকে, পাতলা পায়খানা হয়, বমি বমি ভাব হয়, চোখে ঝাপসা লাগে, প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয় এবং যৌন ক্রিয়ার সমস্যা হয়।

চিকিৎসা :
প্রতিরোধই হচ্ছে মূলত ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির চিকিৎসা। একবার নিউরোপ্যাথি হয়ে গেলে তা আর নিরাময় করা সম্ভব হয় না। তবে কঠোরভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে নিউরোপ্যাথি আরও খারাপ অবস্থায় যাওয়া বন্ধ করা যায়।

তাই ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথির চিকিৎসা হলো-
১. কঠোরভাবে যথাযথ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ।
২. নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা।
৩. নিউরোপ্যাথির উপসর্গ তারও চিকিৎসা। যেমন- ব্যথার ওষুধ, নিউরো ভিটামিন ইত্যাদি। নিউরোপ্যাথিজনিত ব্যথার জন্য সাধারণ ওষুধ ছাড়াও কয়েকটি বিশেষ ওষুধ যেমন (Pregabalin, duloxetin) ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৫. অটোনমিক নিউরোপ্যাথির রোগীদের নিয়মিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ডায়াবেটিস রোগীর পায়ের যত্ন : ডায়াবেটিস রোগীর পায়ের যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পায়ে অনুভূতির কোনো সমস্যা দেখা দিলে পায়ে যাতে অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা কিছু না লাগে, পায়ে যাতে কোনো আঘাত না পাওয়া যায়, এ ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হবে। পায়ের জুতা নির্বাচনে সব ধরনের সাবধানতা থাকতে হবে, যাতে জুতা দ্বারা কোনো ক্ষত সৃষ্টি না হয়।রোগীদের ধূমপান করা কোনোভাবেই চলবে না। কারণ ধূমপান পায়ের রক্ত চলাচল কমিয়ে দেয়। এতে করে পায়ে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া এবং পচন ধরার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। পায়ে একবার পচন ধরলে অনেক সময় পা কেটেও ফেলতে হয়।

ডা. মো. জাহেদ হোসেন
নিউরো সার্জন ও স্পাইন সার্জন
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল

তথ্যসূত্র: দৈনিক সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *