ডায়াবেটিস রোগীর কিডনির সমস্যা ও করণীয়

স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় ডায়াবেটিসের রোগীর কিডনি বিকল হবার আশঙ্কা কুড়ি গুণ বেশি। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের কুড়ি থেকে ত্রিশ শতাংশের কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ওই রোগের কারণে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডায়াবেটিসের রোগীদের প্রায় পয়ত্ৰিশ শতাংশ এরকম ডায়াবেটিস নেফ্রোপ্যাথিতে আক্রান্ত।

কিছু পরিবারে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের প্রায় কেউ কিডনির এরকম সমস্যার শিকার হন না। অন্য কিছু পরিবারে প্রায় আশি শতাংশের, একটা পর্যায়ে কিডনি বিকল হয়। এ থেকে ধারণা করা যায় ডায়াবেটিসে কিডনি ক্ষতিগ্ৰস্ত হবার পেছনে রোগীর বংশগত কারণ পুরোপুরি না হলেও কিছুটা দায়ী।

ডায়াবেটিস দেখা দেবার প্রথম দশ থেকে পনেরো বছর কিডনি স্বাভাবিক কর্মক্ষম থাকে। প্রথম পর্যায়ে কিডনি আস্তে আস্তে আয়তনে বাড়ে। বাড়ে কিডনির রক্ত ছাঁকার ক্ষমতা (Filtration Rate)। এর পরবর্তী পর্যায়ে রোগীর প্রস্রাবে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি খুব সূক্ষ্ম অ্যালবুমিন (Microalbumin) নামের প্রোটিন আসতে থাকে। তৃতীয় ও প্রান্তিক পর্যায়ে মূত্রে সাধারণ মাপের অ্যালবুমিন (Macroalbumin) চলে আসতে শুরু করে। সাধারণ মূত্র পরীক্ষায় অ্যালবুমিন ধরা পড়ার পর অবস্থার অবনতি হতে থাকে দ্রুতলয়ে।

• যাঁদের ব্লাড থুকোজ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। 
• যাঁরা দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে ভুগছেন। 
• ডায়াবেটিসের সঙ্গে যাঁরা রক্তচাপের আধিক্যে ভুগছেন।
• যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিসে কিডনি বিকল হবার ইতিহাস রয়েছে।
• যাঁদের পরিবারে উচ্চ-রক্তচাপের ইতিহাস রয়েছে।
• যাঁরা ভারতসহ এশিয়ার কোনও দেশে বাস করেন। 
• যাঁদের ডায়াবেটিসের কারনে অন্য ছোট রক্তনালী ঘটিত জটিলতা (Microvascular Complication) যেমন ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বা নিউরোপ্যাথি।

প্রস্রাবের সঙ্গে প্রোটিন শরীর থেকে বেরিয়ে আসা ক্ৰমাগত বাড়ে। রোগীর হাত পা ফোলে, অ্যানিমিয়া দেখা দেওয়ায় শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়। কিডনির রক্ত ছাঁকার ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকায় বাড়তে থাকে রক্তে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা। শেষ পর্যন্ত রোগী চলে যায় রেনাল ফেইলিওর-এর দিকে। এই অবস্থায় ডায়ালিসিস ছাড়া রোগীকে বাঁচানো যায় না।

কিডনির কর্মক্ষমতা কমার প্রাথমিক পর্যায়ে, যখন প্রস্রাবে মাইক্রোঅ্যালবুমিন পাওয়া যাচ্ছে, কিছু সতর্কতা ও নির্দিষ্ট কিছু ওষুধপত্র ব্যবহার করে কিডনির কর্মক্ষমতা যাতে দ্রুত কমতে না পারে সে ব্যাপারে চেষ্টা করা যায়। এতে কাজও হয়। তবে একবার প্রস্রাবে সাধারণ অ্যালবুমিন বেশি মাত্রায় আসতে শুরু করার পর আর তেমন কিছু করার থাকে না। এই অবস্থায় ওষুধপত্র দিয়ে কিডনির বিরুদ্ধাচারণের গতিকে কমিয়ে, ঠেকা দেওয়া চিকিৎসা চালানোই হল একমাত্র ব্যবস্থা। কিডনির কর্মক্ষমতা খুব কমে গেলে নিয়মিত ডায়ালিসিস করা বা কিডনি প্রতিস্থাপন (রোনাল ট্রান্সপ্ল্যান্ট) রোগীকে বাঁচানোর একমাত্র ব্যবস্থা।

প্রতিরোধ – ডায়াবেটিসের রোগীর কিডনিকে বিকল হয়ে যাবার হাত থেকে বাঁচাতে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থায় কাজ হয়। রোগীর কিডনি একদিনে বিকল হয় না, হয় ধীরে ধীরে, একটানা বহুবছর রক্তে থুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ না থাকলে। ডায়াবেটিসে কিডনির কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে যা দরকার তা হল— (১) নিয়ন্ত্রিত খাওয়াদাওয়া ও নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন যাতে স্বাভাবিকের চাইতে না বাড়ে সেদিকে নজর দেওয়া। (২) রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, নিয়মিত রক্তের সুগার ও প্রস্রাবের মাইক্রো-অ্যালবুমিন পরীক্ষা। (৩) রক্তচাপ বেশি থাকলে চিকিৎসার পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত ওষুধ খেয়ে রক্তচাপকে একটানা নিয়ন্ত্রণে রাখা। (৪) রান্নায় কম নুন দেওয়া, পাতে বা অন্য খাবারে অতিরিক্ত নুন না খাওয়া।

তথ্যসূত্র: হাতের মুঠোয় ডায়াবেটিস –ড. শ্যামল চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *